Advertisement

Responsive Advertisement

তাহার শেষ মেসেজ

রাত তখন গভীর। বাজে প্রায় সাড়ে বারোটা।
পুরো শহরটা যেন ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ছিল, কিন্তু নীলয়ের চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন ছিল না।
বারান্দার এক কোণে বসে সে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল—একটা পুরোনো চ্যাট ওপেন করা।

চ্যাটে শেষ মেসেজটা ছিল মাত্র দুইটা শব্দ—
"ভালো থেকো।"

দুই বছর হয়ে গেছে।
তবুও নীলয় আজও বুঝতে পারে না, মানুষ কিভাবে এত সহজে “ভালো থেকো” লিখে চলে যায়, যখন সে জানে অন্য মানুষটা আর কোনোদিন ভালো থাকতে পারবে না।

মেঘলার সাথে নীলয়ের পরিচয় হয়েছিল এক বর্ষার বিকেলে।
সেদিন হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল, আর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা নিজের ওড়না দিয়ে ফোন ঢাকার চেষ্টা করছিল।
নীলয় ছাতা বাড়িয়ে বলেছিল,
— "চাইলে একটু পাশে দাঁড়াতে পারেন।"
মেঘলা হেসে বলেছিল,
— "ধন্যবাদ, তবে আমি বৃষ্টি ভয় পাই না।"

সেদিন প্রথম নীলয় বুঝেছিল, কিছু মানুষকে প্রথম দেখাতেই আলাদা লাগে।
মেঘলা ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত।
সে খুব জোরে হাসতো না, খুব বেশি কথা বলতো না, কিন্তু তার পাশে থাকলে নীলয়ের মনে হতো পৃথিবীটা এতটাও কঠিন না।
নীলয়ের জীবনে তখন অনেক অন্ধকার ছিল।
বাবা নেই, সংসারের চাপ, নিজের স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে মরে যাওয়া—সব মিলিয়ে সে যেন ভিতর থেকে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু মেঘলা প্রতিদিন একটাই কথা বলতো—
— "সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি শুধু একটু শক্ত থাকো।"

কিছু মানুষ থাকে, যারা ভালোবাসার কথা বলে না,
তবুও তাদের উপস্থিতিই ভালোবাসা হয়ে যায়।
নীলয় কখন যে মেঘলাকে নিজের জীবনের অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছিল, সে নিজেও জানে না।
সকালে ঘুম ভাঙলে মেঘলার মেসেজ,
রাতে ঘুমানোর আগে মেঘলার কণ্ঠ,
মন খারাপ হলে মেঘলার বকুনি—
সবকিছু মিলিয়ে মেয়েটা নীলয়ের প্রতিদিন হয়ে গিয়েছিল।

তারপর একদিন হঠাৎ মেঘলা বদলে যেতে শুরু করলো।
আগের মতো লম্বা কথা না,
আগের মতো অভিমান না,
আগের মতো "খেয়েছো?" না।
শুধু ছোট ছোট রিপ্লাই।
নীলয় বুঝতে পারছিল কিছু একটা বদলাচ্ছে, কিন্তু সে ভয় পেত জিজ্ঞেস করতে।
কারণ মাঝে মাঝে মানুষ উত্তর জানার চেয়ে, না জানাটাকেই বেশি নিরাপদ মনে করে।
সেদিন রাতেও নীলয় লিখেছিল—
— "তুমি আগের মতো নেই কেন?"
অনেকক্ষণ পর রিপ্লাই এসেছিল—
— "সব মানুষ চিরদিন একরকম থাকে না নীল।"
সেদিন প্রথমবার নীলয়ের বুকের ভেতর অদ্ভুত ব্যথা হয়েছিল।

কয়েকদিন পর মেঘলা দেখা করতে চাইল।
পুরোনো সেই লেকের পাশে বসে ছিল দুজন।
চারপাশে হালকা বাতাস, জলের উপর ভাঙা আলো, আর তাদের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দূরত্ব।
মেঘলা নিচের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
— "আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।"
নীলয় কিছু বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হয়নি।
মেঘলা কাঁপা গলায় বলেছিল,
— "আমি চাইনি এভাবে হোক। কিন্তু সব ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত নিজের হয় না।"
নীলয় শুধু তাকিয়ে ছিল।
কারণ কিছু কষ্ট আছে,
যেখানে কান্নাটাও ছোট মনে হয়।

সেদিন মেঘলা চলে যাওয়ার আগে বলেছিল—
— "আমাকে ঘৃণা করো না প্লিজ।"
নীলয় হেসেছিল।
খুব কষ্টের একটা হাসি।
— "যাকে সত্যি ভালোবাসা যায়, তাকে ঘৃণা করা যায় না।"

তারপর মেঘলা চলে গিয়েছিল।
মানুষটা চলে গিয়েছিল,
কিন্তু তার রেখে যাওয়া অভ্যাসগুলো যায়নি।
আজও নীলয় বৃষ্টি নামলে বারান্দায় দাঁড়ায়।
আজও কেউ "ভালো থেকো" বললে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
আজও ফোনের পুরোনো চ্যাটে গিয়ে শেষ মেসেজটা পড়ে।

"ভালো থেকো।"

নীলয় এখন বুঝে গেছে—
কিছু মানুষ জীবনে আসে থাকার জন্য না,

শুধু শিখিয়ে দেওয়ার জন্য—
কাউকে খুব বেশি নিজের করে ফেললে, একদিন নিজের ভেতরটাই ফাঁকা হয়ে যায়।

এত সময় আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

Post a Comment

0 Comments